২.৩. মৃত্যু অ্যালগরিদম

মৃত্যুবুড়ো বলেছিলো, 'মানুষেরা অমনি হয়, যে মরে যায় তাকে কেউ মনে রাখে না।'

গল্পটা পড়েছিলাম শিশু পত্রিকায়। ‘মৃত্যু’ নিয়ে শিশুতোষ পত্রিকায় এমন একটা গল্প ছাপতে পারে সেটা বুঝিনি তখন। তবে গল্পটা টানে এখনো। আর - হয়তোবা মৃত্যু জিনিসটা এখনো একটা ধোঁয়াটে বিষয় বলে। পাশাপাশি ‘জেনারেল হসপিটালে’র মতো টিভি শো দেখতাম সময় পেলে। বিয়ের পর স্বাতীরও দেখি কাহিনী একই। ‘হাউস’, ‘ই-আর’ আর ‘গ্রে’স অ্যানাটমি’ চলে বাসায়। সবকিছুই যেন ঘোরে - কেমন যেন না ফেরার দেশের ধারণায়।

চলুন, কথা বলা যাক অস্কারের ব্যাপারে। রোড আইল্যান্ডের একটা নার্সিং হোমের থেরাপি বিড়াল সে। মানুষ পশু পালার পেছনে যে কয়টা কারণ আছে তার মধ্যে মানসিক শান্তির ব্যাপারটা আসে আগে। বেড়ালগুলো সে ব্যাপারে সাহায্য করে রোগীদের। অস্কারের ব্যাপারটা কিছুটা ভিন্ন। তার একটা ‘অতিপ্রাকৃতিক’ বিষয় মানুষকে করেছে কৌতূহলী।

অস্কার মৃত্যুকে ‘প্রেডিক্ট’ করতে পারে। মৃত্যু শয্যাশায়ী মানুষের পাশে তাকে দেখা দেয় তিন চার ঘন্টা আগে। মানুষটা পৃথিবী ছেড়ে যাবার আগে আগে। যেখানেই থাকুক না সে চলে আসে তার কেবিনে। ব্যাপারটা বিশ্ব জানে নিউ ইংল্যান্ড মেডিসিন জার্নালের একটা লেখা দিয়ে। ২০০৭ এ। এখন আমরা জানি, শতাধিক মৃত্যুকে প্রেডিক্ট করেছে সে। রোগীর নার্স অস্কারের ঘোরাঘুরি দেখে খবর দেয় মানুষটার প্রিয়জনদের। শেষ দেখা করাতে।

একটা আর্টিকেল পড়ছিলাম নিউ ইয়র্ক টাইমসে। নাম - “দিস ক্যাট সেন্সড ডেথ। হোয়াট ইফ কম্পিউটারস কুড, টু?” ডাক্তার হিসেবে মৃত্যু শয্যাশায়ী রোগীদের ১২,০০০এর বেশি ‘প্রগনোসিস’ মানে মেডিকেল কন্ডিশন নিয়ে কথা বলছিলেন আর্টিকেলে। অনেক বছরের অভিজ্ঞতায় ‘’আল্টিমেট মৃত্যু’ সম্পর্কে কিছু প্রজ্ঞা ধরতে পেরেছেন মনে হলো লেখাটায়। উনি কথা বলছিলেন একটা ‘মৃত্যু অ্যালগরিদম’ নিয়ে। যা বের করতে পারবে মৃত্যুর একটা সময় “উইন্ডো”। ৩ থেকে ১২ মাসের। ব্যাপারটা ভীষণভাবে সাহায্য করবে ‘পালিয়াটিভ কেয়ারে’। মানুষ যখন শেষ পর্যায়ে পৌঁছে যান - তখন তার বেঁচে থাকার পাশাপাশি ভেতরের মানসিক, শারীরিক যন্ত্রনাকে কিভাবে সরিয়ে দিয়ে তার শেষ দিনগুলোকে উপভোগ্য করা যায় সেটা নিয়েই কাজ করে এই ‘পালিয়াটিভ কেয়ার’। ব্যাপারটা কাজে দেয় তার ও পরিবারের সদস্যদের কথা চিন্তা করেই।

২০১৬ সালে স্ট্যানফোর্ডের একজন রিসার্চারের গবেষণার কথা বলছিলেন উনি। প্রায় ২ লক্ষ রোগীদের নিয়ে স্টাডি করেছিলেন তারা। প্রতিটা মেডিকেল রেকর্ড থেকে বের করতে চাচ্ছিলেন সেই উইন্ডোগুলো। ধরা যাক, একজন মারা গিয়েছেন এক জানুয়ারিতে। তাহলে তার সেই ‘উইন্ডোটা’ কবে হতে পারতো?

প্রতিটা রোগীর মেডিকেল রেকর্ড, সমস্ত স্ক্যানের আউটকাম, কতদিন ছিলেন হাসপাতালে, কি চিকিৎসা দেয়া হয়েছিলো, কিসে ভালো - খারাপ হচ্ছিলো রোগীর, ডাক্তারের ক্যাজুয়াল নোট - এরকম সব ‘অ্যাট্রিবিউট’এর সঙ্গে ‘ফীচার ইঞ্জিনিয়ারিং’ করে পাঠিয়ে দেয়া হলো মেশিন লার্নিং ফ্রেমওয়ার্কে। প্রতিটা তথ্যের একেকটার ‘ওয়েটেজ’ কি হবে সেটা আগের ডাটাসেট থেকে বের করে ফেলে আমাদের এই ‘মৃত্যু’ অ্যালগরিদম।

মডেলের ‘অ্যাক্যুরেসি’ বাড়াতে এই অ্যালগরিদমকে ট্রেইন করানো হয় ১ লাখ ৬০ হাজার রোগীর ডাটা দিয়ে। ডাটা ‘ইনজেষ্ট’ এর আউটকামকে দেখানো হয় বাকি ৪০ হাজার রোগীর ডাটা দিয়ে। পরীক্ষা করানোর এই ডাটা আগে কিন্তু দেখেনি ‘মৃত্যু’ অ্যালগরিদম। তার প্রেডিকশন অবাক করার মতো। ১০ জনের মধ্যে ৯ জনকে প্রেডিক্ট করা গেছে তার ‘উইন্ডো’তে। ‘ফলস অ্যালার্ম’ রেটও বেশ কম ছিলো। কিছু জিনিস অবাক করেছে ডাক্তারদের। এমন কিছু জিনিসকে ‘অ্যালগরিদম’ - স্ট্রং ‘প্রেডিক্টর’ হিসেবে দেখিয়েছে যা উনারা চিন্তাতেও আনেননি প্রথমে। পরে বুঝতে পেরেছেন ব্যাপারগুলো। আর বাকি ৫%রা বেঁচেছিলেন ১২ মাসের উইন্ডো’র কিছুটা বাইরে। তবে, চেষ্টা থেমে থাকেনি ওখানে।

পিএইচডি রিসার্চার হিসেবে প্রচুর পেপার পড়তে হয় আমাকে। বিশেষ করে ডাটা থেকে কিভাবে বের করতে হয় ‘ইনসাইট’। মেশিন লার্নিং দক্ষ অ্যালগরিদম যা কোটি কোটি ‘ডিসিশন ট্রি’ চালাতে পারে এক সাথে, প্রসেসরের অসাধারণ ক্ষমতা, ট্রিলিয়ন ডাটার ‘অ্যাভেইল্যাবিলিটি’ সন্দিহান করছে আমাকে দিন কে দিন। বিজ্ঞান যেটা কখনো বলছে না - অনেক প্রজ্ঞা আসছে ‘অ্যালগরিদম’এ যেটা মানুষ হয়তোবা আর ধরতে পারবে না সামনে। সময় বলে দেবে সামনের দিনগুলো। হয়তোবা সৃষ্টিকর্তা চেয়েছেন তাই।